ইসলামী অর্থনীতিসমসাময়িক মাসআলা

ফরেক্স ট্রেডিং : শরয়ী পর্যালোচনা

বর্তমান সময়ের অনলাইন অর্থ উপার্জন কিংবা ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে ফরেক্স ট্রেডিং একটি বহুল প্রচলিত বিজনেস প্রক্রিয়া। যেখানে মূলত একটি মুদ্রার সাথে অন্য আরেকটি মুদ্রার বিনিময় করা হয়। আজকের এই প্রবন্ধে ফরেক্স ট্রেডিং সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সহ এর শরয়ী বিধান আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

ফরেক্স কীঃ

ফরেক্স শব্দটি ইংরেজী। Forex হল Foreign Currency Exchange সংক্ষেপে Forex বা FX । অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়। যেমন, আমকেরিকা বা ইউএস এর কারেন্সি হল ডলার। বাংলাদেশের কারেন্সি হল টাকা। ডলার ও টাকা একটির সাথে আরেকটির পারস্পরিক লেনদেন ই হচ্ছে ফরেক্স। প্রথম দিকে কেবল প্রত্যেকে দেশের কেন্দ্রিয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফরেক্স হত। তা এখনো আছে, আন্তর্জাতি লেনদেনের স্বার্থে কেন্দ্রিয় ব্যাংকগুলো তা করতে বাধ্য। 

এরপর একটা পর্যায়ে সেন্ট্রাল ব্যাংকগুলো ছাড়াও দেশের অন্যান্য ব্যাংকের জন্য ফরেক্স বা বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের অনুমতি দেয়া হয়। ফলে প্রতিদিন বড় বড় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দৈনিক হাজার হাজার ডলারের মুদ্রা লেনদেন করে থাকে। ব্যাংকের পাশাপাশি সরকার অনুমোদিত কিছু কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এই ফরেক্স ট্রেডিং বিজনেস করে থাকে। এছাড়া  অন্যকোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগতভাবে ফরেক্স ট্রেডিং নিষিদ্ধ।

মোট কথা, দেশের কেন্দ্রিয় ব্যাংক, অনুমোদিত অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং কিছু মানি এক্সচেঞ্জ কোম্পানি প্রত্যেকেই রিয়েল কারেন্সি তথা বাস্তব মুদ্রার লেনদেন করে থাকে।

ফরেক্স ট্রেডিংঃ

ফরেক্স ট্রেডিং বা উক্ত ফরেক্স তথা মুদ্রা লেনদেনকে ব্যবসায় রূপদান করার বিষয়টি ইদানিংকালে বেশ আলোচনার। বৈদেশিক মুদ্রার দ্রুত উঠা নামার কারণে পূজিবাদী গোষ্ঠী এর মাধ্যমে ব্যাবসার উদ্যোগ গ্রহণ করে। উদ্ভট এক ব্যাবসার আবিষ্কার করে তারা, যেখানে কোন বাস্তব মুদ্রার লেনদেন হয় না; বরং এক কাল্পনিক মুদ্রার লেনদেন করে থাকে। এখানে কোন বাস্তবিক মুদ্রার লেনদেন উদ্দেশ্য থাকে না , উদ্দেশ্য থাকে দুটি বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য উঠা-নামার মার্জিট তথা পার্থক্যটা। এটি ব্রোকারের মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হয়ে থাকে। যেমনটি শেয়ার বাজারে হয়ে থাকে।  

এই ধরণের ফরেক্স ট্রেডিংই হল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। সাম্প্রতিককালে এই বিজনেসই অনলাইন জগতে মানুষ অর্থ উপার্জেনের পথ খুজে বেড়াচ্ছে। এবং বর্তমানে ফরেক্স ট্রেডিং বলতে এই কাল্পপনিক দুটি মুদ্রার মার্জিন ই বুঝানো হয়। 

ফরেক্স ট্রেডিং করার পদ্ধতিঃ

প্রথমে কিছু রিয়েল মুদ্রা ডিপোজিট করতে হয়। এটি করতে হয় কোন শেয়ার মার্কেটের মত কোন ব্রোকারের নিকট। সেই ব্রোকারের অনলাইন সাইটে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পেমেট গেটওয়ের লিংক দেয়া থাকবে। যেমনঃ নেটেলার, স্ক্রিল, অল্টারপে ইত্যাদি যে কোন একটার মধ্যমে একাউন্ট খুলে ডিপোজিট করা যায়।  এরপর ডলার, ইউরো, পাউন্ড ইত্যাদি যেকোন দেশের কারেন্সি ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। যদি এই বেচা-কেনায় লাভ হয় তাহলে সেই লাভ ঐ একাউন্টেই যোগ হবে। আর লস হলে একাউন্ট থেকে কর্তন হয়ে ব্রোকারের একাউন্টে চলে যাবে।

অর্থাৎ এখানে একটি পক্ষ ট্রেডার অন্য পক্ষ ব্রোকার। এই ট্রেড করতে হয় অনলাইনে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে। “Mata Trader-4” নামক একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে অনলাইনেই এই ফরেক্স ট্রেড বা মুদ্রা লেনদেন করতে হয়। যেই ব্রোকার সাইটে একাউন্ট খোলা হবে তারা একটি নাম্বার ও একটি পাসওয়ার্ড সরবরাহ করবে। এ দুটি  “Mata trader-4”  এ ইনপুট করলে ঐ প্লাটফরমে প্রবেশ করা যাবে। একে ট্রেড টার্মিনাল ও বলা হয়। 

ফরেক্স মার্কেটের কারেন্সিঃ

ফরেক্স মার্কেটে মূলত কারেন্সি বেচা-কেনা হয়, তবে সেটা কোন বাস্তবিক কারেন্সি নয়। মূলত ফরেক্স ট্রেড টার্মিনাল ব্যবহার করে যে কারেন্সি পেয়ারের লেনদেন হয়, সেটা অস্তিত্বহীন। সেটা কোন পেপার মানি নয়; বরং রিয়েল কারেন্সির মার্কেট প্রাইজ। একাউন্টে যদি ২০ ডলার লেখা থাকে, তবে এর অর্থ বাস্তবিক ২০ ডলার নয়; বরং ২০ ডলারের মূল্য।  ধরুন, আপনার একাউন্টে ১০ ডলার ক্রয় করলেন, এর অর্থ হল ব্রোকার আপনাকে ১০ ডলারের মার্কেটে যে রেট তার সাথে কিছু প্রফিট এড করে আপনাকে অফার করল। এই অফার অটো ট্রেড টার্মিনালে প্রতিনিয়ত উঠা-নামা করে। এখন যদি আপনি মনে করেন এর দামটা সামনে আর বৃদ্ধি পাবে তাহলে সেই আশায় ওই রেইটটা আপনি কিনবেন। কিসের বিনিময় কিনলেন? মূলত আপনি যা দিলেন তা যেমন বাস্তবে কোন ভ্যুলু নাই, ঠিক তেমনি ব্রকার আপনাকে যা অফার করলে তারও বাস্তবে কোন ভ্যালু নাই।  এমন পরিস্থিতে মার্কেটে মুদ্রা উঠা-নামার মার্জিন টাই হলে আসল, বাস্তবিক কোন কিছুর ই অস্তিত্ব নাই। 

অতএব, বুঝা গেল ফরেক্স ট্রেডিং রিয়েল কারেন্সির কোন লেনদেন হয় না, এবং তা উদ্দেশ্যও থাকে না। উদ্দেশ্য শুধু দুটি মুদ্রার মার্জিন। 

শরঈ বিধানঃ

আন্তর্জাতিক শরীয়াহ স্কলারগণ ফরেক্স ট্রেডিং কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোনে বিবিচনা করে নাজায়েয ফতোয়া দিয়েছেন। (১) এর মৌলিক কারণগুলো নিম্বরূপঃ

প্রথমত, শরীয়তে দৃষ্টিতে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হওয়ার জন্য অন্যতম শর্থ হল, বাস্তব পণ্যের লেনদেন করা। অর্থাৎ অস্তীত্বহীন পণ্যের বেচা-কেনা বৈধ নয়। আমবা ফরেক্স ট্রেডিং পরিচিতি থেকে জেনেছি, তাতে কোন বাস্তবিক মুদ্রার অস্তিত্ব নেই।

দ্বিতীয়ত, ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী দু দেশের মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে অন্তত কোন একপক্ষ কর্তৃক চুক্তির সময়ই মুদ্রা হস্তান্তর করা শর্ত। কারেন্সির ক্ষেত্রে কবয প্রমাণিত হওয়ার জন্য জরুরী হল ক্রয়কৃত কারেন্সি অবিক্রিত কারেন্সি থেকে পৃথক করে নেওয়া, সুনির্দিষ্ট করা এবং ক্রেতা-বিক্রেতার পক্ষ থেকে ঐ কারেন্সি হস্তগত করা। মনে রাখা জরুরী, অন্যন্য দ্রব্যের ক্ষেত্রে ইশারা বা আলামত বর্ণনার দ্বারা তা নির্দিষ্ট করা যায়, কিন্তু কারেন্সি র ক্ষেত্রে তা সরাসরি হস্তগত করা জরুরি। 

বলা বাহুল্য, ফরেক্স ট্রেডিং এ এসব শর্ত অনুপস্থিত।

হাদীসের ভাষ্য,

“তোমরা স্বর্ণ-রৌপ্যের লেনদেন যেভাবে খুশি করো। তবে শর্ত হল, লেনদেনের মজলিসেই তা হাতে হাতে হতে হবে”

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “যে কোন খাবার কিনল সে যেন তা কবয বা হস্তগত করার পূর্বে অন্যত্র বিক্রি না করে।” বর্ণনাকারী বিশিষ্ট ফকীহ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা বলেন, আমার মতে উক্ত বিধান প্রত্যেক বস্তুর ব্যাপারেই প্রযোজ্য হবে।’ – সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বুয়ু, হাদীস নংঃ ৩৮১১; মুসনাদে আহমদ।

তৃতীয়ত, এতে ক্বিমার পাওয়া যায়। ক্বিমার বলা হয়, যে কোন লেনদেনে কেউ কোন কিছুর মালিক হওয়াটাকে এমন শর্তের উপর মওকুফ রাখা যা হওয়া বা না হওয়া দুটির ই সম্ভাবনা রয়েছে। এরই ভিত্তিতে লেনদেনে উভয়পক্ষ হয় লাভবান হবে , কিংবা কখনো ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এই ক্ষেত্রে উভয়পক্ষ সমান। 

ক্বিমারের উল্লেখযোগ্য একটি প্রকার হল, লেনদেনের শুরুতে কোন পক্ষ কোন টাকা দেয় না; বরং প্রত্যেকেই লেনদেন টাকে এমন বিষয়ের উপর মওকুফ রাখে যা হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। ইমাম মালেক রহ উল্লেখে করেন, একজনের একটা উট হারিয়ে গেল, উটটির মূল্য ছিল ৫০ দিনার। এক লোক এসে বলল, আসো চুক্তি করি আমরা, যদি উটটি পাওয়া যায়, তাহলে আমি তা মাত্র ২০ দিনার দিয়ে নিয়ে নিব। আর আনা পাওয়া গেলে তুমি আমার ২০ দিনার নিয়ে নিবে। ইমাম মালেক রহ উক্ত চুক্তি উল্লেখ করার পর লিখেছেন , এটি সবচেয়ে বড় ক্বিমার। (আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা, ৩/২৫৪)

ফরেক্সে যেভাবে ক্বিমার পাওয়া যায়ঃ

যারা ফরেক্স ট্রেড করেন তাদের চুক্তির মধ্যে কোন কারেন্সির ক্রয়-বিক্রয় উদ্দেশ্য নয়, কোন কারেন্সি ও হস্তগত হয় না। বরং মূল্যের তফাত থেকে লাভবান হওয়া উদ্দেশ্য। আর এই লাভ – লস হওয়াটা এমন বিষয়ের উপর নির্ভরশীল যা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। কারেন্সির দাম ঊঠা নামার উপর নির্ভর করে, যাতে কারো হাত নেই।  তাই দেখা যায়, কখনো ব্রোকার লাভবান হয় আবার কখনো ট্রেডার লাভবান হয়। প্রত্যেকের লাভ লসের বিষয়টা অনিশ্চিত। এটিই ক্বিমার।

চতুর্থ, আমাদের দেশিয় আইনে এটি নিষিদ্ধ। শরীয়তের বিধান হল, বৈধ বিষয়ে রাষ্ট্রের অনুগত্য করা ওয়াজিব। অতএব, ফরেক্স ট্রেডিং দেশীয় আইন ও শরীয়াহ আইনে নিষিদ্ধ। তাই প্রত্যেক নাগরিকের এর থেকে দূরে থাকা উচিত। 

১। http://fatwa.islamweb.net/fatwa/index.php?page=showfatwa&Option=Fatwald&ld=332335

কোরআনের বার্তা

কোরআনের বার্তা । ইসলামিক টিউন প্লাটফরম, আহলুসস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকীদার ভিত্তিতে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকের মানতবতার কল্যাণে জীবন সমস্যার নানা দিক ও বিষয় নিয়ে তথাবহুল আর্টিকেল পাবলিশ করে থাকে। আপনিও চাইলে আপনার তথ্যবহুল লেখা পাবলিশ করতে পারেন কোরআনের বার্তায়। আপনার লেখা জমা দিতে উপরের মেনুবার থেকে "আমাদের কাছে লিখুন" মেনুতে ক্লিক করুন ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button