বিবিধ
Trending

সালাতুল বিতরঃ বিধি ও পদ্ধতি (পর্ব-০১)

বিতর শব্দের অর্থ বিজোড়। এ সালাতুল বিতর তিন (বিজোড়) রাকাত আদায় করা হয় বিধায় একে সালাতুল বিতর বলা হয়। কেননা, তিন একটি বিজোড় সংখ্যা। সালাতুল জুমুআ ও পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের পর গুরুত্বপূর্ণ একটি সালাত হলো সালাতুল বিতর। হানাফি ইমামগণের মতে উক্ত সালাতের শরয়ি হুকুম হলো ওয়াজিব। যা পরিত্যাগ করা গুনাহের কাজ। কোনক্রমে ছুটে গেলে তা পুনরায় কাজা করা আবশ্যক।

বিতর সালাতের হুকুম:

হানাফি মাযহাব মতে, সালাতুল বিতর আদায় করা ওয়াজিব। তা আদায় না করলে কবিনা গুনাহ হয়। কোন কারণে ছুটে গেলে পওে তা কাজা করা ওয়াজিব। এ সালাতের আবশ্যকতা হাদিস দ্বার প্রমাণিত।
দলিল-১: হযরত বুরায়াদা রা. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন-
سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم: الوتر حق فمن لم يوتر فليس منا الوتر حق فمن لم يوتر فليس منا الوتر حق فمن لم يوتر فليس منا
“আমি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি যে, বিতর অপরিহার্য, যে বিতর পড়ে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়; বিতর অপরিহার্য, যে বিতর পড়ে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়; বিতর অপরিহার্য, যে বিতর পড়ে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।
দলিল-২: অন্য হাদেিস আছে, হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন, الوتر واجب على كل مسلم
প্রত্যেক মুসলিমের উপর সালাতুর বিতর আদায় করা আবশ্যক।
এ হাদিসটি বিধানগত মারফু। কারণ, কোন সাহাবি নিজের পক্ষ থেকে এরূপ বলতে পারেন না।
ফজিলত ও সময়:
এশার সালাতের পর থেকে সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিতর সালাতের সময থাকে।এ ালাতের ফজিলত ও তা আদায়ের সময় বুঝা যায় নি¤েœাক্ত হাদিস দ্বারা। যেমন: হজরত খারেজা বিন হুজাফাহ রা. ঊলেনম একদা মহানবি সা. আমাদেও নিকট বের হয়ে বললেন- إن الله أمدكم بصلاة هي خير لكم من حمر النعم الوتر جعله الله لكم فيما بين صلاة العشاء إلى أن يطلع الفجر
নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে একটি সালাত দান করেছেন, যা তোমাদের জন্য লালা উট অপেক্ষা উত্তম। সালাতটি হলো বিতর। তিনি উহাকে তোমাদেও জন্য এশার সালাত ও ফজর উদিত হওয়ার সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে নির্ধারণ করেছেন।
হজরত জাবের রা. থেকে বর্ণীত, রাসুল সা. বলেন- من خاف أن لا يقوم من أخر الليل فليوتر أوله و من طمع أن يقوم أخره فليوتر أخرالليل فإن صلاة أخر الليل مشهودة و ذالك أفضل
যে ব্যক্তি শেষ রাত্রে জাগ্রত হওয়ার ব্রাপাওে ভয় পায় সে যেন প্রথম রাত্রে বিতর পড়ে নেয়। আর যে শেষ রজনীতে জাগ্রত হওয়ার আশা রাখে, সে যেন শেষ রাতেই বিতর পড়ে। কেননা, শেষ রাতের সালাতে ফেরেশতারা হাজির হয়। আর ইহাই উত্তম।
বিতর সালাত কাযা করার বিধান:
পূর্বে বর্ণিত হয়েঝে যে, বিতর সালাতের সময় হলো এশার সালাতের পর থেকে সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত। তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত ব্যক্তির জন্য উত্ত হলো তাহাজ্জুদেও পওে বিতর পড়া। তবে, অন্যদের জন্য এশার সালাতের পরপর বিতর পড়ে নেযাই উত্তম। কিন্তু কোন কারণে সময়মতো বিতর পড়তে না পারলে পরি অবশ্যই তা কাযা করে নিতে হবে। কারণ, বিতর সালাত আদায় করা যেমন ওযাজিব, তা ছুটে গেলে কাযা করাও ওয়াজিব।
যেমন, হজরত আবু সায়িদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেন, من نام عن وتره أو نسيه فليصله أذا ذكره
যে ব্যক্তি বিতর ঝেড়ে ঘুমিয়ে পড়ল বা পড়তে ভুলে গেল, সে যেন স্মরণ হওয়ার পর তা আদায় করে নেয়।
বিতর সালাত তিন রাকাত এবং দুই রাকাতে সালাম নেই:
মাগরিবের ফরজ সালাতওে রাকাত সংখ্যার মতই বিতরের সালাতের রাকাত সংখ্যা তিন। এবং দুই রাকাত বাদে কোন সালাম নেই।
দলিল: সহিহ বুখারিতে হজসত আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত আছে, أنه سأله عائشه رضي الله عنها كيف كانت صلاة رسول الله صلى الله عليه وسلم في رمضان؟ فقالت ما كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يزيد في رمضان ولا في غيره على إحدى عشرة ركعة يصلي أربعا فلا تسل عن حسنهن وطولهن ثم يصلي أربعا فلا تسل عن حسنهن وطولهن ثم يصلي ثلاثا
তিনি আয়েশা রা. কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রমজান মাসে নবি সা. এর সালাত কেমন হতো? মা আয়েশা রা. ঊললেন, রাসুল সা. রমজান এবং অন্যান্য মাসেও এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। তিনি প্রথমে চার রাকাত পড়তেন, তার দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে কী বলব! এরপর চার রাকাত পড়তেন। এর দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। এরপর তিন রাকাত (বিতর) পড়তেন।
এ হাদিসের ব্যাখ্যা আল্লামা ইবনুল বাত্তাল রহ. বলেন, فدل أن الوتر ثلاث অতএব প্রমানিত হলো যে, বিতার তিন রাকাত।

উক্ত ব্যাখ্যার সমর্থনে সুনানে নাসায়িতে হজরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে- كان رسول الله صلى الله عليه و سلم يصلي من الليل ثمان ركعات ويوتر بثلاث و يصلي ركعتين قبل صلوة الفجر

রাসুল সা. এর পবিত্র অভ্যস এই ঝিল যে, তিনি রাতে আট রাকাত তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং তি রাকাত বিতর পড়তেন। আর ফজরের পূর্বে দু’রাকাত (সুন্নাত) পড়তেন।১০

সহিহ মুসলিমে হজরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদিসের শেষে আছে, ثم أوتر بثلاث অত:পর তিনি তিন রাকাত বিতর আদায় করলেন। ১১

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল স. বলেন- صلاة الليل مثنى مثنى فإذا أردت أن تنصرف فاركع ركعة توتر لك ما صليت قال القاسم ورأينا أناسا منذ أدركنا يوترون بثلاث

ওাতের সালাত দুই রাকত, দুই রাকাত কওে পড়তে হয়। অত:পর যখন তুমি সালাত শেষ করতে চাও তখন দুই রাকতের সাথে আরো এক রকাত পড়। যা তোমার আদায়কৃত সালাতকে বিতর বা বিজোড় বানিয়ে দেবে। তাবেয়ি হজরত কাসেম বিন মুহাম্মদ রহ. বলেন, আমরা বালেগ হওয়ার সময় থেকেই দেখছি সকল মানুষ তিন রাকাত বিতর পড়ছেন। ১২

হজরত সাদ ইবনে হিশাম রহ. বর্ণনা করেন- عن عائشة: أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا صلي العشاء دخل المنزل ثم صلى ركعتين ثم صلى بعدهما ركعتين أطول منهما ثم أوتر بثلاث لا يفصل فيهن

হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রামুল সা. পবিত্র অভ্যাস এই ছিল যে, তিনি এশার সালাতের পরে ঘরে প্রবেশ করতেন। অত:পর দুই রাকাত সালাত পড়তেন। তারপর আরো দুই রাকাত সালাত আদায় করতেন, যা পূর্বে থেকে আরো দীর্ঘ হতো। অত:পর তিন রাকাত বিতর পড়তেন, তার মাঝে (২ রাকাত পওে সালামের মাধ্যমে) ফাসেলা করতেন না। ১৩

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

স্মর্তব্য যে, রাসুল সা. সাধারণত শেষ রাতে বিতর সালাত আদায় করতেন। তাই তাঁর বিতর সালাতের পদ্ধতি সম্পর্কে মা আয়েশা রা. ই বেশি অবগত ছিলেন। আর মা আয়েশা রা. থেকে তিন রাকাতের বিতর সংক্রান্ত হাদস পাওয়া যায়। তাই বলা যায়, মহানবি স. তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তবে, বিভিন্ন বর্ণনায় মা আয়েশা থেকে বিতরের রাকাত সংখ্যা নিয়ে যে বিভিন্নতা দেখা যায় তা মুলত: তাহাজ্জুদের সালাতকে বিতরের সাথে যোগ কওে বলার কারণে। কারণ, উভয় সালাত রাতে পড়ার কারণে, কিয়ামুল লাইল ও সালাতুল বিতর একটি নাম অন্যটির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন, মহানবি সা. এর রাতের তাহাজ্জুদ ও বিতরের সমন্বয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংখ্যক রাকাত সালাত পড়ার বর্ণনা সহিহ সুত্রে সুনানে আবু দাউদসহ বিভিন্ন হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায়। যার প্রত্যেকটিতে বিতর সালাতকে তিন রাকাত বলা হয়েছে। যেমন: আব্দুল্লাহ বিন আবু কায়েস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, قلت لعائشة رضي الله عنها: بكم كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوتر قالت: كان يوتر بأربع و ثلاث و ست و ثلاث و ثمان و ثلاث و عشر و ثلاث ولم يكن يوتر بأنقص من سبع ولا بأكثر من ثلاث عشرة
আমি মা আয়েশা রা. কে বললাম, রাসুল সা. কত রাকাত বিতর পড়তেন। তিনি বললেন,তিনি বিতর পড়তেন চার এবং তিন রাকাত দ্বার, ছয় এবং তিন রাকাত দ্বারা, আট এবং তিন রাকাত দ্বারা, দশ এবং তিন রাকাত দ্বারা। তিনি ৭ রাকাত (৪+৩) এর কমে এবং ১৩ রাকাতের (১০+৩) বেশী দ্বারা বিতর পড়তেন না।১৪

এ হাদিস দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তাহাজ্জুদ সালাতকে বিতর সালাতের রাকাতের সাথে যোগ কওে বলা হয়েছে। তাই বিতর সালাতওে রাকাত সংখ্যার ভিন্নতা মুলত: এই কারণে হয়েছে। এখান থেকে আরেকটি বিষয বেশ পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, সত্যিকারের বিতর সালাত ৩ রাকাত । কেননা, ৭,৯,১১, এবং রাকাতের বর্ণনা প্রত্যেক বারেই তিন কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে। এবং ৭(৪+৩) রাকাতের কমে বিতর পড়তেন না বলে আরো স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বিতর রাকাত তিন রাকাত।

যেমনটা বুঝা যায়, হজরত আমের আশ শাবি রহ. এর বর্ণনা থেকে। তিনি বলেন- سألت عبد الله بن عباس و عبد الله بن عمر عن صلوة رسول الله صلى الله عليه وسلم بالليل فقالا ثلاث عشرة ركعة منها ثمان ويوتر بثلاث و ركعتين بعد الفجر

অর্থাৎ, আমি ইবনে আব্বাস ও ইবনে উমর রা. কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, রাসূল সা. এর সালাত কেমন ছিল? তারা উভয়েই জবাব দিলেন, তা ছিল ১৩ (তের) রাকাত। রাতের সালাত বা কিয়ামুল লাইল হলো ৮ রাকাত। ৩ রাকাত ছিল বিতর। এবং ফজর উদিত হলে ২ রাকাত সুন্নাত পড়তেন।১৫

রাসুল সা. এর সালাতের আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবি হলেন হজরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা.। তিনি মহানবি সা. এর রাতের সালাত দেখার জন্য স্বীয় খালা এবং রাসুল সা. এর স্ত্রী হজরত মায়মুনা রা. এর গ্রহে একদা রাত্রি যাপন করেছিলেন। এ হাদিসটি খুবই প্রসিদ্ধ। ইবনে আব্বাস রা. থেকে উক্ত রাতের বিবরণ সম্বলিত হাদস অনেকেই বর্ণনা করেছেন। যেমন: মুহাম্মদ বিন আলি তার পিতা থেকে এবং তিনি তার দাদা থেকে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. থেকে মহানবি সা. বর্ণনা করেন- إنه قام من الليل فاستن ثم صلى ركعتين ثم نام ثم قام فاستن و توضأ و صلى ركعتين حتى صلى ستا ثم أوتر بثلاث و صلى ركعتين

রাসুল সা. রাতে শয্যা থেকে উঠলেন। এরপর মেসওয়াক করলেন। তারপর দুই রাকাত সালাত পড়লেন। অত:পর ঘুমালেন। তারপর আবার উঠে মেসওয়াক করে অযু করলেন এবং দুই রাকাত সালাত পড়লেন। অত:পর তিন (৩) রাকাত বিতর পড়লেন এবং সবশেষে আরো দুই রাকাত সালাত পড়লেন।১৬

দেখা গেল, মহানবি সা. এর রাতের সালাতের দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবি হজরত আবনে আব্বাস রা. এবং মা আয়েশা রা. এর মতামত এক হয়ে গেছে। অতএব প্রমাণিত হলো, বিতর সালাত তিন রাকাত।

মুসনাদে আহমদে হজরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে সহিত সনদে আরো বর্ণিত আছে, মহানবি সা. তিন রাকাত বিতর পড়তেন।১৭

উক্ত কিতাবে হাসান সনদে হজরত আলি রা. থেকেও বর্ণিত আছে, মহানবি সা. তিন রাকাত বিতর পড়তেন।১৮

হজরত আলি রা. নিজেও তিন রাকাত বিতর পড়তেন। ১৯

হজরত ইমরান বিন হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত, মহানবি সা. তিন রাকাত বিতর পড়তেন। ২০

হজরত উবাই বিন কা’ব রা. থেকে বর্ণিত আছে, أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يوتر بثلاث ركعات নিশ্চয়ই রাসুল সা. তিন রাকাত বিতর পড়তেন।২১

হজরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. থেকে বর্ণিত, মহানবি সা. তিন রাকাত বিতর পড়তেন।২২

হজরত হুমাইদ রহ. বলেন, আনাস বিন মালেক রা. তিন রাকাত বিতর পড়তেন।২৩

হজরত আবু গালেব থেকে বর্ণিত, হজরত আবু উমামা আল বাহেলি রা. তিন রাকাত বিতর পড়তেন।২৪

হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, وتر الليل كوتر النهار صلوة المغرب ثلاثا অর্থাৎ, রাতের বিতর দিনের বিতর তথা মাগরিবের মতই তিন রাকাত।

হজরত মিসওয়ার বিন মাখরামা রা. বলেন, دفنا أبا بكر ليلا فقال عمر أني لم أوترفقام وصففنا وراءه فصلى بنا ثلاث ركعات لم يسلم إلا في أحخرهن
আমরা রাতের বেলায় হজরত আবু বকর রা. কে দাফনকার্য সমাপ্ত করলাম। হজরত ওমর রা. বললেন, আমি বিতর পড়িনি। অত:পর তিনি দাড়ালেন এবং আমরাও তার পিছনে কাতার দিলাম। তিনি আমাদেরকে নিয়ে ৩ রাকাত সালাত পড়লেন, যার শেষে ছাড়া তিনি সালাম ফিরালেন না।২৫
হজরত ইবরাহিম নাখয়ি র. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত উমার রা. বলেছেন- ما أحب أني تركت الوتر بثلاث وإن لي حمر النعم অর্থাৎ, আমি তিন রাকাত বিতর পড়া পরিত্যাগ করা পছন্দ করি না ; যদিও এর বিনিময়ে আমাকে লাল উট দেয়া হয়।২৬
আর হজরত উমার রা. এ তিন রাকাত বিতর এক সালামে এবং দুই বৈঠকে পড়তেন। যার প্রমাণ হলো- হাবিব আল-মুয়াল্লিম যা বর্ণনা করেছেন। যেমন: قيل للحسن أن ابن عمر كان يسلم في الركعتين من الوتر فقال: كان عمر أفقه منه كان ينهض في الثالثة بالتكبير
হাসান বসরি রহ. কে বলা হলো- ইবনে উমার রা. বিতরের দুই রাকাতে সালাম ফিরান। তখন তিনি বললেন, হজরত উমার রা. তাঁর চেয়ে বড় ফকীহ ছিলেন। তিনি তো ( ২য় রাকাতের পর শুধু তাশাহহুদ পড়েই সালাম না ফিরিয়ে) ৩য় রাকাতের জন্য তাকবির দিয়ে দাাঁড়িয়ে যেতেন।২৭

বিতরের সালাত যে তিন রাকত তার প্রমাণ হজরত উমারৃ রা. এর খেলাফতকালে এজমায়ি আমল। কেননা, হজরত উমার রা. যখন হজরত উবাই রা. এর পিছনে মুসল্লিদেরকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে জামাতের সাথে তারাবির সালাত আদায় করতে বললেন, তখন উবাই রা. ২০ রাকাত তারাবিহ এবং ৩ রাকাত বিতর পড়েছিলেন। যেমন, ইয়াযিদ বিন রুমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- كان الناس يقومون في زمان عمر بن الخطاب رضي الله عنه في رمضان بثلاث و عشرين ركعة

হজরত উমার রা. এর জামানায় রমজান মাসে সাহাবায়ে কেরাম ২৩(২০+৩) রাকাত সালাত পড়তেন। ২৮
হজরত আ’মাশ রহ. বলেন, তারাবিহ ২০ রাকাত এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন।২৯
বিভিন্ন মাযহাবে তারাবির সালাতের রাকাত সংখ্যার পার্থক্য থাকলেও বিতর সালাত তিন রাকতই রয়েছে।

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, فإنه قد ثبت أن أبي بن كعب كان يقوم بالناس عشرين ركعة في قيام رمضان ويوتر بثلاث فرأى كثير من العلماء أن ذالك هو السنة لأنه أقامه بين المهاجرين و الأنصار ولم ينكره منكر

বিশুদ্ধ সুত্রে প্রমাণিত যে, হজরত উবাই ইবনে কা’ব রা. তার ইমামতিতে লোকদেও নিয়ে বিশ রাকাত তারাবিহ অত:পর তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তাই অনেক আলেম মনে করেন, তারাবির ক্ষেত্রে এটিই প্রকৃত সুন্নাত। কারণ তিনি অনেক মুহাজর ও আনসারের সামনে এ সালাত পড়েছেন। কিন্তু তাদেও কেউ এর বিরোধিতা করেন নি।৩০
এখান থেকে আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হয যে, মহানবি সা. এবঙ হজরত আবু বকর রা. এর জামানায়ও বিতর ৩ রাকাতই পড়া হতো। কেননা হজরত উমার রা. তাদের খেলাফ কোন আমল করলে সাহাবায়ে কেরাম অবশ্যই তাতে বাঁধা দিতেন। সুতারাং বলা যায়, বিতরের সুন্নাহ সম্মত রাকাত সংখ্যা হলো তিন।

তথ্যসুত্র:
১. যা গুরুত্বেও দিক থেকে ফরজের নিচে এবং  সুন্নাতের উপরে।
২. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৪১৯; মুুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস নং ১১৪৬,১১৪৭, ইমাম হাকেম বলেন হাদিসটি সহিহ। তবে আললাম নিমাভি রহ. বলেন, সঠিক কথা হল- হাদিসটির সনদ হাসান পর্যায়ের এবং ইবনুল হুমাম রহ. ও এরূপ বলেছেন। জামেউ আহাদিসিল আহকাম, ইদারাতুল কুরাআন, করাচী, পাকিস্তান, ২য় সংস্করণ, খ-১, পৃষ্ঠা ৩৭১ দ্রষ্টব্য।
৩. মুসনাদে বাযযার, মাজমাউজ জাওয়াদে, হাদিস নং-৩৪৪০, হায়ছামি রহ. বলেন, এ তাদিসের সনদে জাবের জুফি রয়েছে। তাকে নিয়ে অনেক কথাবার্তা রয়েছে। তবে, সুফিয়ান সাওরি তাকে ছেকাহ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। শায়খ যফর আহমদ উসমানি রহ. বলেন, পকৃতপক্ষে হাদিসটি হাসান। দেখুন, ইলাউস সুনানের মতন, খ ১, পৃ ৩৭৩ (উক্ত কিতাবের ৩৭২ পৃষ্ঠায় আরো রয়েছে যে, বর্ণিত হাদিসটি সুনানে আবু দাউদে হযরত আবু আইয়ুব রা. থেরেক মারফু সুত্রে বর্ণিত আছে।আত তা’লিকুল মুগনিতে রয়েছে- আবু আইয়ুব রা. এ হদিসে সকল রাবী নির্ভরযোগ্য। ইমাম আবু হাতেম এবং জুহলি রহ. ও হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।)
৪. জামে তিরমিযি, হাদিস নং-৪৫২; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস নং-১১৪৮, ইমাম হাকেম বলেন, হাদিসটির সনদ সহিহ। ইমাম যাহাবি রহ. ও হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। হাদিসটিকে কেউ কেউ দয়ীফ বললেও ইমাম জায়লায়ী রহ. তাদেও মতামত খন্ডন কওে একে সহিহ প্রমাণ করেছেন। (নসবুর রায়াহ, খ-২, পৃ:১০৯)। ইমাম আবু দাউদ রহ. ও হাদিসটিকে (১৪১৮ নং এ) উল্লেখ কওে চুপ রয়েছেন।
৫. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮০২
৬. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-১৪৩১
৭. কেননা, দু’রাকাতের কম কোন সালাত নেই। (তিরমিযি, হাদিস নং-৫৯৭) দু’রাকাতের বেশি তিন বা চার রাকাতওয়ালা সালাত আছে। আর যে সকল হাদিসে أوتر بواحدة কথাটি উল্লেখ আছে- তার সঠিক অর্থ হলো তিনি এক রাকাত দ্বারা (পূর্ববর্তী সালাতকে) বিজোড় করলেন। কারণ, মহানবি সা. কখনোই শুধুমাত্র এক রাকাত সালাত পড়েন নি। বরং, বিতরের বিজোড় রাকাতের পূর্বে আরো দু’রাকাত সালাত পড়ে নিতেন। এবং সঠিক বর্ণনা মতে, উক্ত তিন রাকাত হতো এক সালামে। যেমনটা বর্ণিত আছে সহিহ বুখারির ১০৯৬ নং হাদিসে। আর ইমাম মালেক রহ. শুধুমাত্র এক রাকাত বিতর পড়াকে মাকরুহ বলেছেন। যেমন প্রখ্যাত তাবেয়ী ইবরাহীম নাখয়ী রহ. থেকে বর্ণিত আছে- بلغ ابن مسعود أن سعدا يوتر بركعة قال:ما أجزأت ركعة فقط ইবনে মাসউদ রা. এর নিকট এমর্মে সংবাদ পৌঁছাঁলো যে, সা’দ রা. এক রাকাত বিতর পড়েন। তখন তিনি বললেন, এক রাকাত কখোনই যথেষ্ট হবে না। শায়খ যফর আহমদ বলেন, যায়লায়ী রহ. বলেন, হাদিসটির রাবীগণ সকলে ছেকাহ। হাদিসটি সহিহ মুরসাল। দেখুন, জামেউ আহাদিসিল আহকাম, খ:১, পৃ:৩৮২
৮. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১০৯৬, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭৫৭
৯. ইবনু বাত্তাল, শরহু সহিহিল বুখারি, খ:৪, পৃ:২০১
১০. সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং-১৭০৪, হাদিসটি সহিহ।
১১. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-১৮৩৫
১২. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৯৪৮
১৩. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-২৫২৬৪; মুহাক্কিক আল্লামা শুয়াইব আরনাউত বলেন, মুহাম্মদ বিন রাশেদ ছাড়া হাদিসের বাকি বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য বা ছেকাহ এবং বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনাকারী। ইমাম যাহাবী বলেন, সে হুজ্জাত নয়। তবে, মুহাম্মদ বিন রাশেদকে ইবনে হাব্বান, ইহমদ, ইবনু মুয়িন, ইবনুল মুবারাক এবং নাসায়ী ছেকাহ বলেছেন।
১৪. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-১৩৬৪; শায়খ জফর আহমদ উসমানি রহ. বলেন, হাদিসটির সনদ হাসান পর্যায়ের। ইলাউস সুনানের মতন দ্রষ্টব্য, খ:১, পৃ:৩৭৫।
১৫. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-১৩৬১, তাহাবী, শরহে মায়ানিল আছার, হাদিস নং-১৫৪৪; হাদিসের রাবীগণ সহিহ হাদিসের রাবী।
১৬. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-৩২৭১ ; মুহাক্কিক আল্লামা শুয়াইব আরনাউত বলেন, মুসলিমের শর্তানুসারে শক্তিশালী।
১৭. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-২৭২০
১৮. মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-৬৮৫
১৯. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদিস নং-৬৮৪৪
২০. সুয়ুতী, জামেউল আহাদিস, হাদিস নং-৪০৭২৫
২১. নাসায়ী, সুনানে কুবরা, হাদিস নং-১৪৩২
২২. তাবরানী, আল মুজামুল আওসাত, হাদিস নং-৭৮৮৫
২৩. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদিস নং-৬৮২৪
২৪. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদিস নং-৬৮২৬
২৫. তাহাবী, শরহু মায়ানিল আছার, হাদিস নং-১৬১১; (আল্লামা নিমাভি রহ. বলেন, হাদিসটির সনদ সহিহ। দেখুন, ইলউস সুনানের মতন, খ:১, পৃ:৩৭৭।
২৬. মুহাম্মদ ইবনে হাসান, মুয়াত্তা, হাদিস নং-২৬০(শায়খ জফর আহমদ উসমানি রহ. বলেন, হাদিসটি সহিহ মুরসাল)
২৭. মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদিস নং-১১৪১
২৮. বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান, হাদিস নং-৩২৭০
২৯. কিয়ামুর রামাদান লিল মাওয়ারদী
৩০. ইবনে তাইমিয়া, আল ফাতাওয়া আল কুবরা, খ:২, পৃ ২৫০(শামেলা)

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close